সাবেক প্রধান বিচারপতি খায়রুল হক গ্রেপ্তার

Khairul
১৫৬

মোস্তফা কামাল তোহা, ঢাকাঃ বিচারাঙ্গনে দীর্ঘদিন ধরে আলোচিত-সমালোচিত ব্যক্তিত্ব, সাবেক প্রধান বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হক অবশেষে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে গ্রেপ্তার হলেন। বৃহস্পতিবার (২৪ জুলাই) সকাল ৮টার কিছু পর রাজধানীর ধানমন্ডির বাসা থেকে তাকে আটক করে ডিবি পুলিশ। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন ডিবির যুগ্ম কমিশনার মোহাম্মদ নাসিরুল ইসলাম

তিনি জানান, “সকাল আটটার কিছু পর আমরা সাবেক প্রধান বিচারপতি খায়রুল হককে ধানমণ্ডির বাসা থেকে আটক করি। তাঁকে ডিবি কার্যালয়ে আনা হচ্ছে। পরবর্তীতে তার বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

বিতর্কিত রায়, পক্ষপাতের অভিযোগ এবং ন্যায়বিচারের প্রশ্ন

২০১০ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর দেশের ১৯তম প্রধান বিচারপতি হিসেবে শপথ নেওয়া খায়রুল হক, মাত্র আট মাস দায়িত্ব পালন করে ২০১১ সালের ১৭ মে অবসর গ্রহণ করেন। কিন্তু স্বল্প এই সময়েই তার বিচারিক কর্মকাণ্ডে দেশে সৃষ্টি হয় দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক অস্থিরতা ও বিচার বিভাগে পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ।

তার অন্যতম বিতর্কিত রায় ছিল সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনী বাতিল, যার ফলে দেশে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বিলুপ্ত হয়। এই রায়ের পর থেকেই রাজনীতিতে সংঘাতের দ্বার উন্মোচিত হয়, এবং অনেকের মতে, ক্ষমতায় আসীন সরকারকে ‘ভোট ডাকাতি’র পৃষ্ঠপোষকতা দেওয়ার পথ তৈরি হয়।

একের পর এক বিতর্ক

খায়রুল হকের বিরুদ্ধে অভিযোগের তালিকা দীর্ঘ:

  • রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানকে স্বাধীনতার ঘোষক নন বলে রায় দিয়ে রাজনৈতিক বিতর্কে জড়ান।

  • কয়েকজন সিনিয়র বিচারপতিকে উপেক্ষা করে তাকে প্রধান বিচারপতি নিয়োগ দেওয়া হয়।

  • ত্রাণ তহবিলের টাকা দিয়ে নিজের চিকিৎসা করিয়ে জনরোষে পড়েন।

  • বিতর্কিত একাধিক বিচারপতিকে শপথ পড়ানো

  • আদালতের আগাম জামিনের এখতিয়ার সংকুচিত করা ও 

  • বেগম খালেদা জিয়াকে ক্যান্টনমেন্টের বাড়ি থেকে উচ্ছেদে ভূমিকা পালন। 
    সবকিছু মিলিয়ে তিনি রাজনৈতিক পক্ষপাত ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগে অভিযুক্ত।

মামলা ও আইনি প্রক্রিয়া

শেখ হাসিনা সরকারের শেষ সময়ে তিনি আইন কমিশনের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তবে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে সরকারের পতনের পর ১৩ আগস্ট তিনি পদত্যাগ করেন। এরপর থেকেই তিনি গা ঢাকা দেন।

তার বিরুদ্ধে ইতোমধ্যে সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনী বাতিলের রায়ে জালিয়াতি ও ক্ষমতার অপব্যবহার সংক্রান্ত একাধিক মামলা হয়েছে। সর্বশেষ গত বছরের ১৮ আগস্ট, ঢাকা আইনজীবী সমিতির সদস্য ইমরুল হাসান তার বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেন।

জাতীয়তাবাদী আইনজীবীদের প্রতিক্রিয়া

সম্প্রতি জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ফোরাম সংবাদ সম্মেলন করে খায়রুল হকের গ্রেপ্তার ও বিচার দাবি করে। তারা তাকে “বিচার বিভাগ ও গণতন্ত্র ধ্বংসের প্রধান কারিগর” হিসেবে উল্লেখ করে।
তাদের ভাষ্য, “তার বিচার হলেই দেশের বিচার বিভাগে জনগণের আস্থা ফিরবে।”

অবশেষে আইনের মুখোমুখি

দীর্ঘদিন নানাভাবে রক্ষা পেলেও, অবশেষে আইনের হাত এড়াতে পারলেন না খায়রুল হক। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিলুপ্তি, রাজনৈতিক পক্ষপাতদুষ্ট রায়, ক্ষমতার অপব্যবহার, সবকিছু মিলিয়ে তিনি আজ ইতিহাসের এক কলঙ্কিত অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত