গঙ্গা থেকে পদ্মা: রাজবাড়ীতে বাঁধ নির্মাণ সময়ের দাবি

Gangya
১৮৮

বিশেষ প্রতিবেদন, প্রিয় আলোঃ  বাংলাদেশের ইতিহাস, সংস্কৃতি ও জীবনধারার সঙ্গে নদীর সম্পর্ক নিবিড় ও জীবন্ত। পদ্মা, যমুনা, মেঘনা, ব্রহ্মপুত্র। এসব নদী কেবল ভূগোল নয়, হাজার বছরের সভ্যতা ও সংস্কৃতির শিরা-উপশিরায় প্রবাহিত। কিন্তু এই নদীই যখন পরিণত হয় অস্তিত্বের সংকটে, তখন তা কেবল পরিবেশ নয়, রাষ্ট্রনীতির গভীর সংকেতও বয়ে আনে।

পদ্মা নদী, গঙ্গার প্রধান শাখা হিসেবে পরিচিত, দীর্ঘকাল ধরে বাংলাদেশের কৃষি, মৎস্য, পরিবেশ ও জনজীবনের প্রাণসঞ্চারী বাহক। কিন্তু ১৯৭৫ সালে ভারতের পশ্চিমবঙ্গে ফারাক্কা ব্যারেজ চালু হওয়ার পর থেকে এই নদীর গতিপথ, প্রবাহ ও চরিত্র আমূল পরিবর্তিত হয়েছে।

ফারাক্কার কারণে শীত মৌসুমে পদ্মায় পানির প্রবাহ মারাত্মকভাবে কমে যায়। বাংলাদেশ অংশে পানির অভাবে পদ্মার নাব্যতা হারাচ্ছে, নদীখাতে চর পড়ছে, পানির স্তর নিচে নেমে যাচ্ছে এবং কৃষিকাজ ধ্বংসের মুখে পড়ছে। আর বর্ষা মৌসুমে ভারত গঙ্গার অতিরিক্ত পানি ছেড়ে দিলে হঠাৎ করে পানির উচ্চতা বেড়ে যায় এবং বন্যা ও নদীভাঙনের তীব্রতা বহুগুণে বেড়ে যায়। ফলস্বরূপ, বাংলাদেশের নদী অববাহিকার এলাকাগুলোতে প্রতিবছরই দেখা দিচ্ছে মানবিক বিপর্যয়।

বিশেষজ্ঞদের মতে, গঙ্গা অববাহিকায় ভারত ইতোমধ্যেই ১৭টির বেশি বাঁধ ও ডাইভারশন পয়েন্ট তৈরি করেছে। এর ফলে গঙ্গার শাখা নদী পদ্মার প্রবাহে পড়ছে ব্যাপক নেতিবাচক প্রভাব। এমনকি আন্তর্জাতিক নদী ব্যবস্থাপনা নীতিমালার আলোকে ভারতের একতরফা পানি প্রত্যাহার একধরনের নদী আগ্রাসনের নামান্তর।

১৯৯৬ ইং সালের ৩০ বছর মেয়াদি গঙ্গা পানি চুক্তির আওতায় বাংলাদেশকে শুষ্ক মৌসুমে নির্দিষ্ট হারে পানি সরবরাহের প্রতিশ্রুতি দিলেও বাস্তবে তা প্রায়ই মানা হয় না। ২০১৯ ইং সালের একটি গবেষণায় দেখা যায়, মার্চ ও এপ্রিল মাসে রাজশাহী অঞ্চলে পদ্মার পানি প্রবাহ ঘণ্টায় ১০০ কিউসেকের নিচে নেমে আসে, যা কৃষি ও মৎস্য চাষের জন্য চরম হুমকি।

পদ্মা নদী বেষ্টিত সবক’টি জেলাসহ বিশেষ করে রাজবাড়ী জেলার গোয়ালন্দ, পাংশা ও বালিয়াকান্দি সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত। আরও স্পষ্ট করে বললে- এই তিনটি উপজেলা ফারাক্কার প্রভাবে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত। বর্ষায় হঠাৎ পানি প্রবাহের কারণে তীব্র নদীভাঙনে গত এক দশকে অন্তত ৫ হাজার পরিবার গৃহহীন হয়েছে। বিলীন হয়েছে প্রায় ২০টির বেশি প্রাথমিক বিদ্যালয়, মসজিদ ও হাটবাজার। অন্যদিকে শীতে পানি সংকটে শত শত বিঘা জমি অনাবাদি পড়ে থাকে।

এক সময় পদ্মা নদীর ওপর ভর করে রাজবাড়ী থেকে মাদারীপুর, ফরিদপুর, পিরোজপুর, খুলনা পর্যন্ত নৌপথে যাত্রী ও পণ্য পরিবহন ছিল স্বাভাবিক। এখন এসব নৌরুটের অনেকগুলোই অকেজো। পানির গভীরতা ও প্রবাহের অভাবে ছোট ট্রলার পর্যন্ত চালানো যায় না।

এই প্রেক্ষাপটে রাজবাড়ীতে একটি পরিকল্পিত ও প্রযুক্তিনির্ভর বাঁধ বা ব্যারেজ নির্মাণ সময়ের দাবিতে পরিণত হয়েছে। ভৌগোলিকভাবে রাজবাড়ী এমন একটি স্থানে অবস্থিত, যেখানে পদ্মার বক্রতা বা মি‌য়ান্ডারিং প্রকৃতি বাঁধ নির্মাণের জন্য উপযোগী। এখানে বাঁধ নির্মিত হলে উজানের পানি সংরক্ষণ, প্রয়োজন অনুযায়ী নিয়ন্ত্রিত প্রবাহ ও বন্যা নিয়ন্ত্রণ; সবই একসঙ্গে বাস্তবায়ন সম্ভব।

বিশ্বব্যাপী বাঁধ নির্মাণের উদাহরণও আমাদের পথ দেখাতে পারে। যেমন, চীনের থ্রি গর্জেস ড্যাম কেবল বিদ্যুৎ উৎপাদনের নয়, বরং বন্যা নিয়ন্ত্রণ, কৃষি ও পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনায় যুগান্তকারী ভূমিকা রেখেছে। ভারত নিজেই গঙ্গার প্রধান শাখাগুলোর উপর একাধিক ব্যারেজ ও চ্যানেল নির্মাণ করেছে নিজেদের পানির নিরাপত্তার জন্য। তাহলে বাংলাদেশ কেন পিছিয়ে থাকবে?

রাজবাড়ীতে একটি ব্যারেজ নির্মাণ মানে কেবল পানি নিয়ন্ত্রণ নয়, এটি একটি রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক বার্তা। এটি রাষ্ট্রের জল সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠার প্রকাশ। ভূপ্রকৌশলবিদ ও পানি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নদী ব্যবস্থাপনায় বাংলাদেশের বর্তমান দুর্বলতা শুধরাতে হলে স্থানীয়ভাবে বাঁধ নির্মাণ ছাড়া বিকল্প নেই।

রাজবাড়ীতে বাঁধ নির্মাণের মাধ্যমে যে সুবিধা সমূহ অর্জন করা সম্ভব: বর্ষার সময় পানি নিয়ন্ত্রণ ও নদীভাঙন রোধ,  শীতে সংরক্ষিত পানি কৃষিতে ব্যবহারের সুযোগ, মৎস্য ও জলজ প্রাণীর জন্য পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষা, নৌপথ পুনরুজ্জীবন ও নদী কেন্দ্রিক অর্থনীতির পুনরুদ্ধার এবং পদ্মা নদীর নাব্যতা পুনরুদ্ধার ও পরিবেশগত পুনর্জীবন।

সরকার চাইলে এ প্রকল্পকে জাপান, চীন বা বিশ্বব্যাংকের মতো উন্নয়ন সহযোগীদের মাধ্যমে বাস্তবায়ন করতে পারে। এ ধরনের প্রকল্প বাস্তবায়নে রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও কৌশলগত পরিকল্পনা থাকলে অর্থায়ন বড় বাধা হবে না।

সবশেষে বলা যায়, পদ্মা আর কেবল একটি নদী নয়। এটি একটি জীবনধারা, ইতিহাস ও ভবিষ্যতের স্বপ্ন। এই নদীর মৃত্যু মানে বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের জনজীবন, খাদ্য নিরাপত্তা ও পরিবেশের মৃত্যু। তাই রাজবাড়ীতে বাঁধ নির্মাণ এখন বিলাসিতা নয়, জাতীয় নিরাপত্তা ও উন্নয়নের অপরিহার্য অঙ্গ। এই উদ্যোগ সফল করতে হলে প্রয়োজন রাজনৈতিক সাহস, প্রজ্ঞা এবং জনগণের সক্রিয় সমর্থন।

লেখক-

মোস্তফা কামাল তোহা 

তরুণ  লেখক ও সাংবাদিক, ডিবিসি নিউজ