র‌্যাব-পুলিশকে পাত্তাই দিচ্ছেনা জেনেভা ক্যাম্পের মাদক কারবারিরা

129e5e28 2455 4e7d 9482 d597f9fd6994
১৭৭

মাত্র ১শ গজ দুরেই র‌্যাবের বের গাড়ি। র‌্যাব সদস্যরা দাঁড়িয়ে গল্প করছেন একে অপরের সাথে। অপর প্রান্তে দাঁড়িয়ে আছে থানা পুলিশের গাড়ি। তারাও গল্পে মগ্ন। আর ঠিক তাদের নাক বরাবর দেদারসে চলছে মাদকের বেচাকেনা। অনেকটাই প্রকাশ্যে। সড়ক দিয়ে হেঁটে যাওয়া মধ্যকয়সী নারী-পুরুষ ও যুবক-যুবতীদের ডেকে ডেকে মাদক বিক্রির চেষ্টা। প্রতিবেদকের অনুসন্ধান চলাকালে সম্প্রতি রাজধানীর মোহাম্মাদপুরের ‘মাদকের আখড়া’ খ্যাত জেনেভা ক্যাম্পের চারপাশ ঘুরে এমন চিত্র দেখা গেছে। মোহাম্মাদপুর সরকারি মডেল স্কুল অ্যন্ড কলেজ’ এর ফটক থেকে একটু দুরেই দাঁড়িয়েছিল র‌্যাব ২ এর গাড়ি। গাড়ির বরাবর গজনবী রোডে হাঁকডাক করেই চলছিল মাদকের বেচাকেনা। গজনবি রোডের অপর পাশে পুলিশের গাড়ি থাকলেও এতে বসে থাকা পুলিশ সদস্যদেরও মাদক কারবারিদের ধরতে কোনো পদক্ষেপ নিতে দেখা যায়নি।

মাদকের আগ্রাসন কমাতে প্রতিনিয়ত অভিযান পরিচালনা করছে যৌথ বাহিনী। পুলিশের পাশাপাশি র্যা ব ও সেনাবাহিনীর অভিযানে গ্রেপ্তার হচ্ছে শীর্ষ মাদক কারবারিসহ তাদের অনুসারীরা। এসব অভিযানে মাদক কারবারিদের দৌরাত্ম কমার কথা থাকলেও হচ্ছে তার উল্টোটা। জেনেভা ক্যাম্পের সাধারণ বাসিন্দারা বলছেন অভিযানের আগেই খবর পেয়ে মাদক ব্যবসায়ীরা পালিয়ে যায়। পুলিশ কিংবা যৌথবাহিনী অভিযান পরিচালনা করলে যাদের ধরপাকড় করা হয় তাদের বেশিরভাগই ক্যাম্পের সাধারণ বাসিন্দা অথবা মাঠ পর্যায়ের খচরা মাদক বিক্রেতা।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বর্তমানে জেনেভা ক্যাম্পের শীর্ষ হেরোইন ব্যবসায়ী হিসেবে পরিচিত ‘মাদকসম্রাট’ বুনিয়া সোহেল। তবে তার গ্রেপ্তারের পর হেরোইন ব্যবসার আধিপত্য দখল করে সৈয়দপুরিয়া বাবু। সম্প্রতি তাকে গ্রেপ্তার করা হলেও ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ এখনো তার কাছে। ইয়াবা ব্যবসায় অন্যতম হোতা ছিল চুয়া সেলিম। তাকে গ্রেপ্তারের পর সম্প্রতি সেই স্থান দখল করে নেয় শান্ত। এ ছাড়া চুয়া সেলিমের কিছু অংশে আধিপত্য বিস্তার করছে নেটা সামির ও তার মামা কামরান। অন্যদিকে শীর্ষ মাদক কারবারি ইশতিয়াকের মৃত্যুর পর গাঁজা ব্যবসার হাল ধরেছে তারই ম্যানেজার জাভেদ।

এ ছাড়া অন্যান্য শীর্ষ মাদক কারবারির মধ্যে রয়েছে ‘ইয়াবা সম্রাট’ খ্যাত পাকিস্তানি রাজু এবং গাঁজা ব্যবসার অন্যতম হোতা ‘মাদকসম্রাজ্ঞী’ রানী। গাঁজার অপর একটি সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ করছে বুনিয়া সোহেলের ভাই টুনটুন, পিচ্চি রাজা, কান কামরান ও তার বড় ভাই সুরজ। গাঁজায় পৃথক সিন্ডিকেট গড়ে তুলেছে জয়নুল, মোনা, সগির এবং এস কে রাব্বানী। এ ছাড়া দীর্ঘদিন কারাভোগের পর জামিনে মুক্ত হয়ে আবারও মাদক কারবার শুরু করেছে ইয়াবা সুন্দরী পাপিয়ার স্বামী পাচু ওরফে নদিম। আবার শীর্ষ মাদক ব্যবসায়ীদের গ্রেপ্তারের পর অনেক খুচরা ব্যবসায়ীও এখন সরাসরি কক্সবাজার বা টেকনাফ থেকে মাদক এনে ক্যাম্পে বিক্রি করছে।

সূত্র বলছে, জেনেভা ক্যাম্পের ১ নম্বর সেক্টরের মসজিদ গলিতে জাভেদের মাদক স্পট পরিচালনা করে ইরফান। সে জেনেভা ক্যাম্পের বোবা বিরিয়ানির মালিক আলতাফের ছেলে। ২ নম্বর সেক্টরে ক্যাসেট দোকানের সামনের মাদকের স্পটটি পরিচালনা করছে পিচ্চি রাজা। একই এলাকায় মাদক বিক্রি করে নাঈম ওরফে পিস্তল নাঈম। মূলত শামীম হোটেলের সামনে মাদক বিক্রি করে নাঈমের লোকজন। ক্যাম্পে কাপড়ের মার্কেট এলাকার ইয়াবার স্পট চালায় নেটা সামীর। ইয়াবা সুন্দরী পাপিয়ার স্বামী পাচু ওরফে নাদিমের স্পট গফুর হোটলের সামনে।

এ ছাড়া পিচ্চি রাজা, সামির ওরফে পিচ্চি সামির, মনু ওরফে কোপ মনু, শাহ আলম, আরজু ওরফে মুতনা আরজু, হাসিব ওরফে লেলা হাসিব, নাদিম, ফরিদ ও কান কামরান ও সুরজসহ খুচরা পর্যায়ে শতাধিক ব্যবসায়ী এখন নিজেরাই মাদক এনে নিজ নিজ স্পট গড়ে তুলছে।

সুরজ ও কামরান আগে পিচ্চি রাজার হয়ে মাদক বিক্রি করত। বর্তমানে তারা কক্সবাজারের টেকনাফ থেকে নিজেরাই ইয়াবা কিনে আনছে। ১ নম্বর সেক্টরে নিজের বাসা থেকেই ইয়াবার স্পট চালায় তারা। ১ নম্বর সেক্টর থেকে মডেল স্কুল পর্যন্ত ঘুরে ঘুরে মাদক বিক্রি করে সুরজের লোকজন। সম্প্রতি কক্সবাজার থেকে ফেরার পথে চট্টগ্রামের আনোয়ারায় সুরজকে গ্রেপ্তারে অভিযান চালায় জেলা ডিবি পুলিশের একটি টিম। কিন্তু অভিযানের আগেই প্রাইভেট কার থেকে নেমে পালিয়ে যায় সুরজ।

মোহাম্মদপুর জোনের সহকারী পুলিশ কমিশনার (এসি) এ কে এম মেহেদী হাসান বলেন, ‘মাদকের বিরুদ্ধে অভিযান পুলিশের নিয়মিত কার্যক্রম। মোহাম্মদপুরে যেহেতু একাধিক বস্তি আছে, সেই বস্তিকে কেন্দ্র করে মাদক কারবারিরা বেপরোয়া হয়ে উঠছে। এ জন্য আমরা নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করছি। আমরা সাফল্যের সঙ্গে শীর্ষ মাদক কারবারিসহ অনেক মাদক ব্যবসায়ীকে গ্রেপ্তারে সক্ষম হয়েছি।’